default | grid-3 | grid-2

Post per Page

দুই ইয়ারির কথা (দ্বিতীয় ভাগ)



চুপকে সে শুন, ইস পল কি ধুন, ইস পল মে জীবন সারা
আমাদের প্রথম ফালুট দর্শন ছিল স্বপ্নের মতো। পুরো উপত্যকায় শুধু আমরা কজন আর কেউ নেই। হ্যাঁ ফালুট ট্রেকার্স হাটের care taker অবশ্য ছিল। পুরো ট্রেকার্স হাট ফাঁকা। প্রথমবার যেখানে থাকার জন্য জায়গাই পাইনি, এবার পুরোটাই আমাদের। কেমন একটা রাজা রাজা feel হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল পুরো ফালুটটাই আমাদের সাম্রাজ্য আর ট্রেকার্স হাট টা আমাদের রাজমহল। তবে এখন যেহেতু ফালুট পর্যন্ত গাড়ি যায় তাই ওটাও এখন একটা ক্যাঁচর ম্যাঁচর যায়গা হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত আপনাদের একটা জ্ঞান দি, প্রতেকটা জায়গার একটা নিজস্ব মেজাজ আছে, আপনি সেই মেজাজ এর সাথে যত বেশী নিজেকে অভিযোজন করবেন সেই যায়গা তত বেশী করে ধরা দেবে আপনার কাছে। যেমন সমুদ্রে স্বভাব গর্জন, তাই সমুদ্রে নেমে কেউ যদি ক্যালানের মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে ব্যাপারটা ঠিক জমে না, ওখানে একটু হই চই করাটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে পাহাড়ের স্বভাব হলো নির্জন, শান্ত তাই সেখানে গিয়ে কেউ যদি নির্জনতা টা ভঙ্গ করে তখন তাতে আপনার পাশের লোকটি যেমন বিরক্ত হয় তেমনি পাহাড়ও কিন্তু সমপরিমান বিরক্ত হয়, সে তখন আপনার কাছে কখনও পূর্নরূপে ধরা দেবেনা। আমি জানি উত্তেজনা বসত "ওমা ওটা দেখ", "ইসস কি অঅসাম", "আ্যাই একটা ছবি তুলে দাও না" এই শব্দবন্ধগুলো আস্তে বাধ্য, কিচ্ছু করার নেই। কিন্তু সেগুলো যদি অন্তত দু চার স্কেল নীচু তে বলা যায় তাহলে আপনার আশেপাশের লোকও বিরক্ত হয়না আর আপনারও কার্যসিদ্ধি হয়ে যায়। পাহাড়ের নিজস্ব একটা ভাষা আছে, একবার মুখটা একটু কম ব্যাবহার করে চোখ আর কান দিয়ে সেটা উপলব্ধি করে দেখুন, মাইরি বলছি হেব্বি লাগবে।
- অনেক হয়েছে এবার তোর জ্ঞান বন্ধ কর। লোকে এবার পালাবে।
যাই হোক আবার ফালুট ট্রেকার্স হাটে ফিরে আসি। ওখানে পৌঁছে যখন care taker কে ঘর এর কথা জিগ্যাস করি সে বলে, "পূরা ট্রেকার্স হাট হি আপ কা হ্যায়, জিধার মর্জি রেহে যাইয়ে"। আমরা ভেতরের দিকের একটা ঘড়ে যেখানে হাওয়া ঢোকার সম্ভাবনা কম সেখানে নিজেদের মালপত্র গুলো গ্যারেজ করলাম। ফালুট ট্রেকার্স হাটে খুব সম্ভবত ৪ টে বড় ঘড় আছে, সবকটাই ডরমেটরি।
ব্যাগপত্র রেখে আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম সাথে নিয়ে এলাম কিছু কমলা লেবু আর কিছু ড্রাই ফ্রুট। বাইরে তখনও যথেষ্ট আলো রয়েছে। আমরা ফলাহার করতে করতে ভক্তেজীর সাথে আড্ডায় মাতলাম। কোথায় থাকে, বাড়িতে কে কে আছে, আগে কোথায় কোথায় গিয়েছে তার অভিজ্ঞা ইত্যাদি ইত্যাদি। আড্ডা মারতে মারতে প্রায় সন্ধ্যা এল আমরা আবার ট্রেকার্স হাটে ঢুকে এলাম। এক কাপ করে কফি খেয়ে এরপর টুক টাক কথা বার্তা বলছি নিজেদের মধ্যে, এমন সময় ভক্তেজী এসে বললো, "আইয়ে থোড়া হাত প্যাড় সেক লিজিয়ে"। এখানে এসেই সে care taker র সাথে বেশ আলাপ জমিয়ে নিয়েছিল। এতক্ষন ওরা রান্নাঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। আমাদেরও ডেকে নিল রান্নাঘরে। ওখানে উনুনে আমাদের রান্না হচ্ছে আর সেই আঁচেই আমরা হাত পা সেঁকে নিচ্ছি। বাইরে যখন মাইনাস তাপমাত্রা তখন সেই রান্নাঘড়টা ছিল স্বর্গের মতো। ডিনার তৈরি হতে হতে আরেক প্রস্থ আড্ডা চলল।
আমাদের মোবাইলে তখন সীমিত battery, charge না দিলে কাল সারাদিন ছবি তুলতে পারবোনা। তাই আমরা জিগ্গাসা করলাম এখানে mobile charge দেবার কোনও ব্যাবস্থা হতে পারে কিনা। সে জানাল, এখানে battery তে সবকিছু চলে, ক্ষমতা সীমিত তাই mobile charge দিলে emergency তে power পাওয়া যাবে না। আমরাও ব্যাপারটা বুঝে charge করা থেকে বিরত থাকলাম।

বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান
যথা সময়ে dinner চলে এল টেবিলে। ডাল, সোয়াবিন, লাই পাতার সব্জী (পাহাড়ী এক ধরনের শাক) আর পাপড়। টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে খাওয়া দাওয়া হলো। ফালুটে এসে candle light dinner!!! ভাবাই যায়না। সাটিয়ে খেলাম সে রাতটা। খাওয়ার পর একটু বাইরে বেরিয়েছিলাম রাতের প্রকৃতি টা দেখতে। যে দৃশ্য আমি দেখেছিলাম সেদিন দুচোখ ভরে তা আমি বলে বোঝাতে পারব না, আর কোনও ক্যামেরাতেও ধরা সম্ভভ না। চারিদিক নিস্তদ্ধ, যোৎস্নার আলো ঝড়ে পড়ছে পাহাড়ের গা বেয়ে, এক আকাশ তারা আর একটা গোটা একটা উপত্যকায় আমরা একা। ক্যামেরা হয়তো সেই মুহুর্তের একটা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে পারে কিন্তু আমরা সেদিন ওই রাতে পাহাড়ের আত্মা বা রুহঃ টা অনুভব করেছিলাম। ঠাকুর দার -
"আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান ॥"
এক্কেরে খাপে খাপে বইসা যায়।
হ্যাঁ সে রাতে গানও জেগেছিল। সেই রাতে আমি আমার তৎকালীন প্রেমিকা এবং বর্তমান স্ত্রীর জন্য কিছু কথা লিখি, পরবর্তীকালে তাতে সুর দিয়ে একটা গানও তৈরি করি। সেটা ছিল অনেকটা এইরকম -

- অনেক রোম্যান্স হয়েছে, এবার শুতে চলো।
বিছানা বা কম্বল যতই ভালো হোক না কেন, একটু বেশী উচ্চতায় ঘুম ভালো হয়না। একটা তন্দ্রার মধ্যে দিয়ে সারাটা রাত কেটে গেল। ঠাণ্ডাটা সান্দাকফুর মতো না হলেও বেশ ভালই ছিল। তবে হাওয়াটা ছিলনা বলে রখ্যে।


আজ ফির জিনে কি তমন্না হ্যায়, আজ ফির মরনেকা ইরাদা হ্যায়
পরদিন ভোর ভোর উঠে যখন বাইরে বেরোলাম তখন ফালুটের রূপ আবার অনেকটাই আলাদা। রাতে যাকে এতো রহস্যময় লাগছিল সকালে সে অনেকটাই শান্ত স্নিগ্ধ। আমরা জলখাবার খেয়ে সিংহলীলা টপ এর দিকে যাব বলে ঠিক করলাম, সেখান থেকে চুয়াভঞ্জন হয়ে উত্তরে (এটা সিকিম এর একটা জায়গার নাম)। মোট দূরত্ব প্রায় ২৫ কিমি। সেইমতো ৮:৩০ নাগাদ রওনা দিলাম। দূগ্গা দূগ্গা ফালুট।
ফালুট থেকে সিংহলীলা টপ এর রাস্তাটা শুরুতে একটু ওঠা তারপর খানিকটা সমান তারপর খানিকক্ষণ অল্প ওঠা শেষটা প্রায় ৬০ ডিগ্রী ঢালে খাড়া ওঠা। রাস্তাটা মেঠো পথ দিয়ে শুরু হয় তারপর কিছুটা ঝোপঝাড় দিয়ে যাওয়া শেষটা পুরো পাথুরে পাহাড়। প্রথম বিপত্তি টা ঘটলো কিছুদূর এগোনোর পরেই।
রাস্তায় জাগায় জাগায় বরফ জমে আছে। এমন এমন কিছু বাঁক আছে যেখানে একদিকে গভীর খাদ, আর রাস্তায় পুরু বরফ। একটু পা হড়কালেই সোজা নরকে। ভক্তেজী আগে গিয়ে একটা বড় লাঠি ধরছিল আর আমরা এক এক করে লাঠির আরেক দিক ধরে রাম নাম জপতে জপতে গুটি গুটি পায়ে পাড় হচ্ছিলাম। ভক্তেজী সেবার আমাদের শিখিয়েছিল পাহাড়ের ঢালে যদি বরফের ওপর দিয়ে হাটতে হয় তাহলে প্রথমে পায়ের গোড়ালি দিয়ে মেরে আগে গর্ত করে নিতে হয় তারপর সেখানে পা ফেললে হড়কে যাবার সম্ভাবনা কম থাকে। যাহোক করে আমরা বরফের রাস্তাটা পাড় করলাম। এরপর কিছুদূর গিয়ে কাঁটা ঝোপঝাড় শুরু হয়। সেগুলো পেরিয়ে অনেকটা সমতল পথ। তারপর শুরু হয় পাথুরে পাহাড়। বেশ খানিকটা এঁকে বেঁকে ওঠার পর শুরু হলো আসল চড়াই। শেষ কয়েক কিমি উঠতে জান বেড়িয়ে গিয়েছিল। যেখান থেকে প্রথম সিংহলীলা টপ টা চোখে পড়ল সেখান থেকে টপ এ যাবার কোনও নির্দ্দিষ্ট রাস্তা নেই। পুরোটাই উঠতে হবে পাথরের বোল্ডার বেয়ে।
হারামীটা (ইসস কি ভাষা!!!) আমাকে পেছনে ফেলে আগে আগে তর তর করে এগিয়ে যায়। আমি ঘেমে নেয়ে প্রায় মিনিট পনেরো পর টপ এ উঠে ওর কাছে পৌঁছাই। তখন সকাল ১১ টা। সেখানে ওঠার পর যে ছবি দেখলাম তাতে সমস্ত কষ্ট একবারে ফুসমন্তর হয়ে গেল। পুরো হিমালয়ান রেঞ্জ টা প্যানোরমিক ভিউ তে চোখের সামনে। মনে হবে গোটা হিমালয় পর্বতমালা সব শৃঙ্গ সমেত আপনার চারদিকে গোল করে কেউ সাজিয়ে দিয়েছে আর আপনি সেন্টারে দাঁড়িয়ে দেখছেন ১৮০ ডিগ্রী কোনে। এই দৃশ্য দেখে আমি পুরো থ। এমনিতে আমি চড়ম নাস্তিক, কিন্তু এসব দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে ভগবান সত্যিই হয়তো আছে। এদিকে মোবাইলের ব্যাটারি টারও তখনই শেষ হবার ছিল। যদিও মোবাইলে সেই ভিউ ক্যাপচার করা সম্ভবও ছিলনা নিন্তু তবুও সিংহলীলা টপের ওপড় আমাদের কোনও ছবি নেই এই আফসোস টা আজও রয়ে গেছে। আমি যখন চারিপাশের মোহে আচ্ছন্ন তখন ভিক্টর পেছন থেকে বলে এদিকে দেখ। বলে একদিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো। আমি দেখলাম সামনের পাহাড় টা বরফে পুরো সাদা হয়ে আছে। ও বললো বলতো এটা কি? আমি বললাম কি?? জবাব দিল চুয়াভঞ্জন, যেখান দিয়ে আমাদের যাবার কথা। ভক্তেজী জানিয়ে দিয়েছে এই বরফের ওপর দিয়ে যাওয়া একেবারেই সম্ভব না। যাহঃ সালাআআ!!!
এখন আমাদের কাছে দুটো বিকল্প আছে। এক, সেখান থেকে গোর্খে তে ফিরে আসা। নাহয় দুই, আরেকটা ঘুরপথ আছে যেটা দিয়ে একটু ঘুরে উত্তরে পৌঁছানো যায়। বয়স কম রক্ত গরম হলে যা হয় আরকি, ওয়াপস যানা হামারে শান কে খিলাফ হ্যায়। ঠিক হলো, আগে বড়ো। তবে সামান্য যেটা সমস্যা সেটা হলো, ভক্তেজী এই রুট টা ভালোমতো জানেনা। সেটা অবশ্য টের পেয়েছিলাম পড়ে।
সিংহলীলা টপ টা খুব ছোট একটা জায়গা, সেখানে আশেপাশের গ্রামবাসীরা কিছু পাথর একত্রিত করে একটা ভক্তিস্থল মতো বানিয়ে রেখেছে। আর ওখানকার ভাষায় মন্ত্র লেখা কিছু পতাকা ঝোলানো। টপ থেকে নেমে এবার আমরা যেদিকে যাব সেদিকে যাবার জন্য প্রথম যে কটা পা ফেলতে হবে সেই জায়গাটাকে এক চিলতে বললেও বেশী বলা হবে। কোনও রকমে একটা পা রাখার জায়গা আছে। আর ডান দিকে কয়েক হাজার ফিট গভীর খাদ। সালা মর ভি সকতা হ্যায়।
কিছুটা নামার পর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সুন্দর রাস্তা। বড় বড় গাছের জঙ্গল অনেকটা ইউক্যালিপটাস গোছের গাছ। কোথাও আবার কোনও গাছে বহুকাল আগে গোড়া থেকে উপড়ে গিয়েছিল, সেগুলো টপকে যেতে হচ্ছে। নীচে শুখনো পাতা পড়ে থাকায়, খচর মচর শব্দ করে আমরা হেটে যাচ্ছি। বেশ লাগছিল জায়গাটা। এবারের পথটা পুরোটাই নামা। কিছুদূর এগনোর পর চোখে পড়লো একটা সীমা সুরক্ষা বলের camp। সিংসলীলা এস এস বি ক্যাম্প।
অজানা গতিবিধি পেয়ে সেখানকার জওয়ানেরা একটু তটস্ত হয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। কারন ওদিকে অচেনা লোকজন খুব একটা আসেনা। যখন বুঝতে পারল আমরা তেমন ক্ষতিকারক কিছু নই, নেহাতই নিরীহ প্রাণী তখন এগিয়ে এলো আমাদের সাথে আলাপ করতে। ওদের ব্যারাকে নিয়ে গিয়ে গরম গরম মশলা চা আর সাথে কাজুবাদাম খাওয়ালো। আসলে ওরা ঘরবাড়ি বউ বাচ্চা ছেড়ে দিনের পর দিন এসব পান্ডব বর্জিত জায়গায় পড়ে থাকেতো, তাই কোনও লোকজন পেলে ওদেরও ভাল লাগে। ওদের সাথে ওখানে কিছুক্ষন আড্ডা হলো। এরকম একবার মোলে তেও হয়েছিল। যাইহোক ওরা যেটা বললো উত্তরে এখান যেতে খুব একটা বেশি কষ্ট হবেনা। সাড়ে তিন ঘন্টা মত হাটা, পুরোটাই নামা। রাস্তায় একটা সরু নালা মতো পড়বে যেটা আমাদের দুবার পাড় হতে হবে। ব্যাপারটা যতটা সোজা ভেবেছিলাম তার বিন্দুমাত্র নয়।

পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো বলো কবে শীতল হব। কত দূর? আর কত দূর?? বলো মা?
চা টা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে আমরা ড্যাং ড্যাং করে আবার রওনা দিলাম। রাস্তা যেহেতু পুরোটাই নামা ছিল তাই হাটার গতিও বেশী ছিল। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, পাহাড়ে ওঠার চাইতে নামতে বেশী মনঃসংযোগ লাগে। ট্রেকিং এ বেশীর ভাগ দুর্ঘটনা নামার সময়েই হয়ে থাকে। ওঠার সময় শুধু কষ্ট হয় দমের। আপনি একটু রয়ে সয়ে হাঁটলে একটু দেরিতে পৌঁছাবেন ঠিকই কিন্তু দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম। নামার সময় আপনার সারা শরীরকে ব্যালেন্স করতে হয় দুই পা আর হাটুর মাধ্যামে। তাই একটু এদিক ওদিক পা পড়লেই গোড়ালি মচকে যেতে পারে। এটা আপনারা যারা ট্রেক করেন সকলেই জানেন।
ঘন্টা খানেক নামার পর প্রথমবার সেই নালার সাথে সাক্ষাৎ হলো। এটা নীচে গিয়ে কোনও নদীর সাথে মিশেছে। আমরা ঠান্ডা জল চোখে, মুখে ঘাড়ে দিয়ে আবার রওনা দিলাম। এই রাস্তাটা পুরোটাই ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আর বেশ খাড়া। আরো কিছুক্ষন যাবার পর দ্বিতীয়বার আবার সেই নালার দেখা। আমরা আনন্দিত, দুবার নালা পাড় করে নিয়েছি আর দু ঘন্টা হয়েও গেছে আর ঘন্টা দেড়েক হাটলেই উত্তরে। কিন্তু গোলটা বাধলো যখন আরও ঘন্টা খানেক হাটার পর আবার নালা। কি হলো কেস টা?
আমরা ভক্তেজীকে জিজ্ঞাসা করলাম। ভক্তেজী হাম লোগ ঠিক যা রহে হ্যায় তো? সে সম্মতি জানালেও সেই সম্মতির মধ্যে আত্মবিশ্বাস এর অভাব ছিল। ব্যাপারটা ঠিক লাগছিলনা।
আরও প্রায় ঘন্টা খানেক এগিয়ে আমরা পৌঁছলাম Meadow মত যায়গায়। এই যায়গাটার বর্ননা ভাষায় দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমরা কল্পনার জগৎ বলতে exactly যা বুঝি, যায়গাটা ছিল ঠিক তাই, বড় বড় সবুজ ঘাস তার ওপর ঠিক সাত ইঞ্চি করে কুয়াশার চাদর আর একটু দূরে হালকা মেঘের মতো ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা আর ওপরে বিকেলের আকাশ ঝকঝকে নীল। ইংলিশ ফ্যান্টাসি সিনেমাতে এ ধরনের দৃশ্য দেখেছি। মনে হচ্ছিল আমরা মেঘের ওপড় দিয়ে হেটে যাচ্ছি, মাঝে মাঝে অল্প ঘাস দেখা যাচ্ছে কোথাও আবার সামনে হঠাৎ করে কুয়াশার আস্তরন, সামনে কি আছে জানিনা। এখানে ক্যামেরা টা খুব মিস করছিলাম। একটা নেশাচ্ছন্ন ঘোরের মত লাগছিল। প্রায় মিনিট পনেরো হাটার পর আবার জঙ্গল চোখে পড়ল। মোহ টা কেটে যাবার পর এবার প্রথম যে ভয়টা মনে এলো, সেটা হলো আমরা ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো?
আমাদের শরীর তখন ক্লান্ত হতে শুরু করে দিয়েছে। পায়ের ওপর থেকেও নিয়ন্ত্রন আস্তে আস্তে কমছে। এবার নামার সময় আমরা মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর হড়কাতেও শুরু করেছি। এভাবে আরও আধা ঘন্টা পর আমরা একটা সমতল মতো যায়গা পেয়ে একটু বসলাম। আমাদের দুজনের মদ্ধে কথাও তখন কমে গেছিল। ওর মুখ চোখ দেখে বুঝতে পারছিলাম ভয়টা ওর মধ্যেও কাজ করছে। কিছুক্ষন বসে আবার রওনা দিলাম। ভক্তেজী কে দেখলাম একটা উঁচু জায়গায় উঠে চারিদিকে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ভক্তেজী আর কত দূর? উত্তর এল, বস থোড়া অওর। এই থোড়া অওর এর অর্থ যে কি, তা যারা ট্রেকিং করে তারা জানে। এবার বিকেল আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু করেছে।
আমরা এভাবে আরও এক ঘন্টা হাটলাম। তখন আমরা প্রায় রোবটের মতো হাটছি। পা টা অটোমেটিক চলছে, মাথা কোনও কাজ করছেনা। রাস্তায় কতবার যে আছাড় খেয়েছি দুজনে তার কোনও হিসাব নেই। আমরা এতক্ষনে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে আমরা রাস্তা হারিয়েছি। এর মধ্যে হঠাৎ ভক্তেজী উধাও। আমরা ডেকে যাচ্ছি তারস্বরে কিন্তু কোনোও উত্তর নেই। ব্যাস এবার আমাদের যত সাহস যত বিক্রম সব ফুসস। এমনিতেই আমরা এরকম টেনশনের মুহূর্তে আছি তার মধ্যে গাইড হাওয়া। বুঝতেই পারছেন অবস্থাটা কি হতে পারে। তবুও আমরা হেটে চলেছি, থামলে চলবেনা।
একটু বাদেই দেখি ভক্তেজী নীচ থেকে উঠে আসছে। সেদিন বহুত ঝেড়েছিলাম ভক্তেজী কে। ইতিমধ্যে সে স্বীকার করে নিয়েছে যে সে রাস্তা চেনে না। বললাম তুমি যখন রাস্তা জানোনা, আমাদের আনলে কেন? যদিও আসার তালটা আমাদেরই বেশী ছিল। ভক্তেজী বেচারা চুপ। আমরা হেটে চলেছি, যাকিছু হোক হাটা থামালে চলবেনা। এদিকে অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় হতে শুরু করে দিয়েছে। ভয়, টেনসন আর ক্লান্তি মিশে একটা অদ্ভুত অবস্থা তখন। আমাদের মধ্যে কথা তখন পুরোপুরি বন্ধ, শুধু যন্ত্রের মতো পা দুটোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি।

জিন্দেগী কি তালাশ মে হাম, মওত কে কিতনে পাস আ গায়ে
ইতিমধ্যে আমি hallucination দেখা শুরু করে দিয়েছি। আমার জীবনে সেই প্রথম এরকম হয়েছিল। শরীরে আর একফোটাও জোড় নেই। আমি রীতিমতো দেখছি যেই মোড় টা কিছুক্ষন আগে পাড় করে এলাম খানিকটা এগিয়ে আসার পর আবার সেই মোড়টাতেই আছি। আবার দেখছি ঘুটঘুটে রাত হয়ে গেছে আমি একা জঙ্গলে, সাথে কেউ নেই। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তখন। একবার আছাড় খেয়ে খানিকটা গড়িয়েও গেলাম, হাতের লাঠি ছিটকে কোথায় চলে গেল। দিনের আলো তখন একেবারে তলানিতে। সে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এভাবে আরও প্রায় ৪০ মিনিট চলার পর ভিক্টর আমাকে থামিয়ে বললো, শুনতে পাচ্ছিস? আমি নিশ্চিত ছিলাম বাঘ ভাল্লুক কিছুর একটা ডাকের কথা বলছে বোধহয়। আমি জানালাম আমার মাথা কাজ করছেনা। খুব দূর থেকে একটা গাড়ীর হর্নের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
আমি আগেই বলেছি আমি চড়ম নাস্তিক, কিন্তু সেদিন সে মুহূর্তে আমার দুটো হাত জড়ো হয়ে কপাল ছুঁয়েছিল। আরও খানিকটা নামার পর সিংহলীলা ন্যাশনাল ফরেস্টের entry গেট চোখে পড়ল। পাশেই পাথরের রাস্তা। উত্তরের দিক থেকে যারা সান্দাকফু ট্রেক করে তারা এখান থেকে শুরু করে। রাস্তা পেয়ে আমরা ওখানেই বসে পড়লাম। এই গল্পটা শোনানোর ছিল বলেই হয়তো সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে উত্তরের সমস্ত হোটেল প্রায় ১.৫ কিমি ওপড়ে। তখন পুরো সন্ধে। আমরা তখন শারীরিক এবং মানসিক ভাবে এতটাই বিদ্ধস্ত যে ওই ১.৫ কিমি ওঠারও ক্ষমতা নেই। ভক্তেজী একটা স্থানীয় গাড়ী যোগার করে এনে দিলো তারপর আমরা সেই গাড়ীতে করে হোটেলের কাছে এলাম। ওখানে গিয়ে যে হোটেলটাতে উঠলাম সেটার মালিক আবার বাঙালী। হোটেলের নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছেনা।
সময়টা যেহেতু off season ছিল তাই হোটেল ভাড়াটা খানিকটা কম নিয়েছিল। হয়তো কথাবার্তা বলে আরও কমানো যেত, কিন্তু তখন আমরা মাথার ওপড় একটা ছাদ পেয়েছি এটাই অনেক। এবার সমস্যাটা হলো room যেটা পেলাম সেটা তিন তলায়। আমার মনে আছে ওখানে উঠতে সেদিন আমাদের সেদিন ১৫ মিনিট সময় লেগেছিল। ভক্তেজী একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে বেড়িয়ে গেল আড্ডা মারতে। আমরা কোনওমতে হাতে পায়ে চোখে মুখে একটু জল দিয়ে খাটে উঠে বসলাম। ব্যাগ থেকে প্যাক করা ডিমসেদ্ধগুলো বার করলাম, যেগুলো আনা হয়েছিল রাস্তায় লাঞ্চের জন্য। রাস্তায় যা পরিস্থিতি ছিল তাতে লাঞ্চের এক শত আট। আলোচনা করতে লাগলাম আজ কি কি হলো, আর কি কি হতে পারতো।
৭:৩০ নাগাদ ভক্তেজী ফিরে এল। ডিনারের সময় হয়ে গেছে। আমরা ৮:০০ টা নাগাদ আবার যুদ্ধ করে নেমে ডাইনিং পর্যন্ত গেলাম ডিনার করতে। সেদিন ডিনারেও ডিম ছিল সাথে ডাল আর পাপড় ভাজা আর আচার। সেদিন খিদেটা যেমন পেয়েছিল তেমন খেয়েছিলামও প্রচুর। মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে খিদেটা যেন আরও বেড়ে গিয়েছিল। বাঘাদার লাইন টা মনে পড়ে গেল, "মুন্ডু গেলে খাবটা কি?"। আবার ট্রেকিং করে তিন তলায় ওঠা। ওপড়ে এসে ভক্তেজী জানাল আজ আমরা প্রায় ৩৫ কিমি হেটেছি। আমরা শুধু একজন আরেকজনের মুখের দিকে দেখলাম। ভক্তেজী বললো যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে ক্ষমা করে দিতে। ট্রেকিং এ তার খুব একটা বেশী অভিজ্ঞতা নেই, টাকার জন্য করছে। সে আর ৫ টা প্রফেশনাল গাইডের থেকে সত্যিই আলাদা ছিল। যাইহোক সে তাড়াতাড়ি শুতে চলে গেল কাল ভোরে উঠে রওনা দেবে, প্রথমে উত্তরে থেকে জোড়থাং সেখান থেকে রিম্বিক বাজার যেতে হবে। আমরা একদিন উত্তরেতে থাকবো ঠিক করলাম। কিছুক্ষন এদিক ওদিক গল্প করে ১০:৩০ নাগাদ শুতে গেলাম।
পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো ভক্তেজী যখন যাবার জন্য রেডি হলো। ভক্তেজীকে বিদায় জানিয়ে আবার শুতে গেলাম, আমাদের গল্পের থেকে ভক্তেজীর পর্ব এখানেই শেষ। সেই দিনটা আমরা পুরো হোটেলেই কাটিয়েছি। হোটেলের ছাদে চেয়ার নিয়ে বসেছিলাম সারাদিন। বিকেলের দিকে একটু বাইরে বার হই। উত্তরে জায়গাটা বেশ নিরিবিলি ছিমছাম খুব একটা হই হট্টগোল নেই। আমরা আশেপাশের লোকালয় টা একটু ঘুরে দেখলাম। সন্ধায় ফেরার পথে কয়েকটা beer নিয়ে হোটেলের ঘরে ফিরলাম। কালকেই ফিরে যাওয়া আবার সেই গতে বাঁধা জীবনে। হোটেলে বসে এসবই আলোচনা করছিলাম।
- আর কত টানবি? এবার থাম।
- সবাইকে ছেড়ে যেতে, কেমন যেন একটা লাগছে।
- সবাই? সবাই আবার কে??
- কেন, যারা গল্পটা শুনছে তারাও তো সাথেই আছে। পুরো journey তে তারাও তো আমাদের সাথেই ছিল।
- কি যাতা বকছিস? beer এর নাম শুনেই হয়ে গেল নাকি?
pause
- তোর চোখে কি হয়েছে? দেখি তাকা এদিকে।
- কিছুনা, পোকা পড়েছে, দাঁড়া ধুয়ে আসি।
- নাহঃ মালটার দ্বারা কিসসু হবেনা, বহুত emotional মাইরি (স্বগতোক্তি)

No comments

Error Page Image

Error Page Image

Oooops.... Could not find it!!!

The page you were looking for, could not be found. You may have typed the address incorrectly or you may have used an outdated link.

Go to Homepage