default | grid-3 | grid-2

Post per Page

বিদ্যাস্থানে ভয়ো বচঃ



জলের ঢেউগুলো নৌকার গায়ে এসে ধাক্কা মারার ফলে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। তার সাথে জল কেটে কেটে দাঁড় টানার শব্দ। দুটো শব্দই একে অপরকে বেশ সঙ্গত দিয়ে চলছিল। আর এর সাথেই ডানা মেলছিল আমার ভাবনার জাল। ভাবনা অর্থাৎ ভাবনা জৈন, আমার সাথে Maths এর tution এ পড়ে। ভাবনার ভাবনা আর ছলাৎ ছলাৎ একে অপরের সাথে সমানুপাতিক হারেই এগোচ্ছিল। হঠাৎ ব্যস্তানুপাতিক হারে আশে পাশের কিছু কথাবার্তা কানে এসে কাল্পনিক সমীকরণের পিন্ডিটা একেবারে চটকে দিল।



নৌকায় লোকজন বলতে গেলে কেউই ছিলনা। আমি ছিলাম মাঝের দিকের কিনারায়, আর নৌকার মাথার দিকে একজন বয়ষ্ক ভদ্রলোক মাঝির পাশে বসে ছিলেন। ভদ্রলোককে দেখতে বেশ রাশভারী গোছের। পরনে মাড় দেওয়া ধুতি সাথে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী। কপালটা বেশ চওড়া আর চোখে হেমন্ত মুখার্জী টাইপ কালো ফ্রেমের একটা চশমা। আর সবচাইতে আগে যেটা নজরে পড়ে সেটা হলো তার ছড়ি। বেশ সুন্দর কাঠের হাতলওলা একটা ছড়ি। ছড়িটার বিশেষত্ব হলো, সাপের খোদাই করা একটা নকশা গোটা ছড়িটার গা বেয়ে পেঁচিয়ে রয়েছে। সাপের মুখটা শেষ হয়েছে হাতলের কাছে এসে।



ছলাৎ ছলাৎ ছন্দে একটু আধটু রোম্যান্স টোম্যান্স যাও বা নদীর জল থেকে উঁকি ঝুঁকি মারছিল মাঝির হেঁড়ে গলা কানে আসতেই সব আবার অতল সাগরে ডুব দিল।

- মাঝি : কি বলছেন বাবু!!! আপনি বাড়িতে বাঁদর পোষেন?

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : হ্যাঁ কাজের জন্য লাগে।

- মাঝি : বাঁদর খেলা দেখান? এই বয়সে?? কিন্তু আপনাকে দেখে তো...

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : (খানিকটা রেগে গিয়ে) আরে ধুর, খেলা দেখাতে যাব কেন? ওটা আমার হিসাবের জন্য লাগে।

- মাঝি : (দ্বিগুণ বিস্মিত হয়ে) আপনি বাঁদরকে দিয়ে হিসাব করান?



আর এসব শুনে ততক্ষনে আমার মধ্যেও বেশ একটা কৌতুহল জন্মে গেছে। তাই প্রেম জলাঞ্জলি দিয়ে বাঁদরামিতেই মন দিলাম। ব্যপারটাকে কি হচ্ছে সেটা ভালো করে বোঝার জন্য আমি ওনাদের পাশে গিয়ে বসলাম।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : বাঁদর কেন হিসাব করবে? হিসাব তো করবো আমি। আমার বাড়ির উঠোনে একটা খুঁটি পোতা আছে। সেটা আমি রোজ তেল দিয়ে প্রথমে পিচ্ছিল করি তারপর বাঁদরটাকে সেই তৈলাক্ত খুঁটি বেয়ে উঠতে দিই। আগে দেখি কত সেমি উঠছে আর কত সেমি পিছলে পড়ছে। সেই অনুযায়ী হিসেব করি খুঁটিটা পুরো চড়তে ওর কত সময় লাগতে পারে। তারপর ওর চড়া হয়ে গেলে আমার হিসাবের সাথে মিলিয়ে দেখি।



এই ব্যাপারটা আমার খুব চেনা চেনা ঠেকলো, কোথায় যেন এরকম কিছু একটা পড়েছি। এখন মনে পড়ছেনা। এদিকে এসব শুনে মাঝি সেই যে মুখ হা করলো আর সেই হা বন্ধ হচ্ছেনা। এমনকি সে দাঁড় টানাও ভুলে গেছে।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : (খেঁকিয়ে উঠলেন) অমন হাঁ করে কি দেখছিস? পড়াশোনা করেছিস?



খেঁকানি খেয়ে মাঝির সম্বিত ফিরল।



- মাঝি : না বাবু। বলে সে আবার দাঁড় টানায় মন দিল।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : বয়স কতো তোর?

- মাঝি : আজ্ঞে এই পৌষে ৩২ হবে।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : সঠিক ভাবে বল। বছর, মাস, দিন হিসাবে।



মাঝি কিছুক্ষন মাথা চুলকালো। তারপর আবার দাঁড়ে মন দিল।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : আমার বয়স জানিস?

- মাঝি : না বাবু।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : দশ বছর আগে আমার বয়স আমার ছেলের বয়সের দ্বিগুন ছিল। এখন আমার আর আমার ছেলের বয়সের সমষ্টি ৯৫। তাহলে বল এখন আমার বয়স কতো?



মাঝি ভাবার সময় পর্যন্ত নিল না।



- মাঝি : বলতে পারবনা বাবু।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : কে বলতে পারবে এখানে?



আমি বুঝলাম আবহাওয়া খারাপ আছে। এখানে আমি ছাড়া আর তৃতীয় কেউ নেই। এখান থেকে ভালোয় ভালোয় কেটে পড়াই মঙ্গল। সুযোগ বুঝে ওখান থেকে উঠে যাবার উদ্যোগ নিলাম। যেই না উঠতে যাব ওমনি বয়ষ্ক ভদ্রলোক তার ছড়ির হাতল টা দিয়ে আমার জামার কলারটা পেছন থেকে টেনে ধরলেন।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : এই ছোঁড়া যাচ্ছো কোথায়? চুপ করে বোস এখান।



আমি না মানে আমতা আমতা করে আবার সেখানে বসে পড়লাম। মনে মনে ভাবছি সালা কোথায় এসে ফেঁসে গেলাম রে বাবা।



বয়ষ্ক ভদ্রলোক আমাকে বললেন,

- পালাচ্ছো কোথায়? হিসাব করে আমায় উত্তর টা বলো।



আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবার ভান করলাম আর হাতের কর গুনে দেখাবার চেষ্টা করলাম ব্যপারটা আমি করার প্রচেষ্টা করছি। যে বিষয় টা থেকে আমি চিরকাল পালিয়ে বেড়িয়েছি, সেটার পাল্লাতেই পড়তে হলো। তাও আবার এই মাঝ নদীতে। পরিত্রানেরও কোনও উপায় নেই। বিষয়টা ঘোরাবার জন্য আমি মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলাম,

- ঘাট আর কতক্ষণ গো?

- মাঝি : ২০ মিনিট।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : আমরা স্রোতের অনুকূলে যাচ্ছি না প্রতিকূলে?



মাঝি কিছুক্ষন মাথা চুলকে বললো

- অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমের কথা বলছেন? ও এ ঘাটে নয় বাবু, তিন মাইলের ঘাটে।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : আহাম্মক।



বলেই আবার আমার দিকে ঘুরে বললো,

- আচ্ছা বলোতো একটা নৌকা স্রোতের অনুকূলে গিয়ে যদি ২০ মিনিটে তার গন্তব্যে পৌঁছায় তাহলে একই গতিবেগে স্রোতের প্রতিকূলে গেলে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে। ধরে নাও উভয় ক্ষেত্রেই স্রোতের গতিবেগ ১০ কিমি প্রতি ঘন্টা আর পারের দূরত্ব ১২ কিমি।



এবার আমি মনে মনে লোকনাথ বাবা কে ডাকা শুরু করে দিলাম। পরক্ষনেই মনে পড়লো এটা তো রনও নয় বনও আর জঙ্গলও নয়, এতো মাঝ নদী তাই এ থেকে মুক্তির রাস্তা লোকনাথ বাবার jurisdiction এর বাইরে। মাঝি ভাইও দেখছি দাঁড় টানার গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : শিগগিরই হিসাব করে আমাকে জবাব দাও।



বলেই সে আবার মাঝির দিকে ফিরলো। মাঝির মুখ দেখেই বোঝা গেল তার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : এই নৌকাটা কি তোর?

- মাঝি : একার না বাবু আমরা তিনজন মিলে কিনেছি। আমি, খালেক মিয়াঁ আর তিনকরি মন্ডল।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : কত টাকা নিয়েছে?

- মাঝি : আজ্ঞে ৫৫,০০০ টাকা।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : তোরা কত করে দিয়েছিস?

- মাঝি : আমি ১২,০০০ খালেক ৮,০০০ আর তিনু ১০,০০০ আর ২৫,০০০ ব্যাঙ্ক থেকে ঋন নিয়েছি।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : কত শতাংশ সুদ নিচ্ছে ব্যাঙ্ক?

- মাঝি : বছরে ৮ শতাংশ বাবু।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : কবে থেকে ঋন শুরু হয়েছে?

- মাঝি : এইতো মাস তিনেক হলো।



ব্যাপারটা কোনদিকে এগোচ্ছে আমি এবার বুঝতে পেরে গেছি কিন্তু বেচারা মাঝি তখনও বোঝেনি।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : আর লাভের টাকা তোরা কিভাবে নিস?

- মাঝি : ওই মূলধনের হিসাবে। ৬ ভাগ আমি, ৪ ভাগ খালেক আর ৫ ভাগ তিনু।



মাঝি এতক্ষন ভাবছিল বাবু বোধহয় তার সাথে খোশগল্প করছে। মনে মনে ভাবছিল, যাক বাঁচা গেল। কিন্তু তার ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : এবার ধরে নে কাল যদি খালেক বলে আমি ব্যাঙ্কের ঋনের টাকাটা সুদ সমেত মিটিয়ে দিচ্ছি তোরা আমাকে ৭ শতাংশ হারে টাকাটা শোধ দিস। ধর মাসে তোদের গড়ে ১০,০০০ টাকা লাভ হয় আর তোরা ঠিক করলি প্রতিমাসে তোর আর তিনুর লাভ্যাংশ থেকে ৫ শতাংশ খালেক কে দিয়ে তোদের নৌকার ঋন শোধ করবি। তাহলে কতদিনে তোদের ঋন শোধ হবে?



এবার মাঝির মুখটা দেখার মতো ছিল। হাত থেকে দাঁড় টা আর একটু হলেই জলে পড়ে যেত। কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দুহাত জোর করে প্রায় কান্না ভেজা গলায় বললো

- আমায় মাফ করে দিন বাবু।



বয়ষ্ক ভদ্রলোক আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকালেন আমি আবার চট করে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবার ভান করে হাতের কর গুনতে লাগলাম। ভদ্রলোক আবার মাঝির দিকে তাকিয়ে বললেন,

- আরে কাঁদিস না আচ্ছা বল, তোরা তিনজনেই কি নৌকা চালাস?

- মাঝি : (কান্না ভেজা গলাতেই জবাব দিল) হ্যাঁ বাবু।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : সবাই কি আলাদা আলাদা চালাস?

- মাঝি : কখনও কখনও একসাথেও চালাই।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : একসাথে চালালে নিশ্চয়ই গন্তব্যে পৌঁছাতে কম সময় লাগে।

- মাঝি : হ্যাঁ তা তো কিছুটা কম লাগেই।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : আচ্ছা এই সোজা জিনিসটা বল দেখি, তোরা দুজন মিলে দাঁড় টেনে একটা যায়গায় যদি ৪৫ মিনিটে পৌঁছাস তাহলে বল দেখি তিনজন দাঁড় টেনে সেই যায়গা পৌঁছাতে হলে কতক্ষন দাঁড় টানতে হবে?



এবার যে ব্যাপারটা হলো আমি তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। মাঝি নৌকা ফৌকা দাঁড় টাঁর ফেলে সোজা জলে ঝাপ দিল। তারপর‍ যেভাবে পারে সাতার কেটে অন্য দিকে পালাতে লাগলো। আমি তো দেখে পুরো থ। এদিকে দেখি ভদ্রলোকের কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। কিছুক্ষন হাওয়াতে কিসব ভেবে মাঝির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললো,

- কিরে কোথায় পালাচ্ছিস? আচ্ছা একজনের হিসাবটা তো বলে যা। ওওও মাঝি...



-কিরে শুনতে পাচ্ছিস?



আর কে শোনে কার কথা!!! মাঝির সাঁতার কাটার গতি আরও বেড়ে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ব্যাটা তো বেঁচে গেলো। এবার আমি ভাবছি আমার কেয়া হোগা রে কালিয়া?



যত রকম ঠাকুর দেবতা আছে সব একসাথে স্মরণ করা আরম্ভ করে দিলাম। এই প্রথমবার বুঝতে পারলাম বাবা মায়ের কথা না শোনার ফল কি হতে পারে! মা কতবার করে বলেছিল ঢাকুরিয়া লেক ক্লাবে সাঁতার টা শিখে নিতে। তার বদলে লেকে গিয়ে প্রেম করেছি। ইচ্ছে করছিল নিজেই নিজের পেছনে দুটো লাথি মারি। এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

- কি হলো যেগুলো হসাব করতে দিয়েছিলাম? হয়েছে?



আমি বুঝতে পারলাম না কি বলবো? আমার হাত পা কাঁপছে। শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলাম,

- না।



এবার যেই ঘটনাটা ঘটলো তা আমি আমার চরম দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি।



বয়ষ্ক ভদ্রলোক রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,

- এই সামান্য অংক করতে এতক্ষন লাগে? মেরে তোমাদের পিঠের ছাল তুলে দিতে হয়।



এই বলে রাগের মাথায় নিজের ছড়িটা নৌকার মধ্যে জোরসে ঠুকে দিল। তাতেই চরমতম বিপত্তিটা ঘটল, নৌকায় একটা ফুঁটো হয়ে গেল। আর সেখান থেকে ধীরে ধীরে জল নৌকার ভেতর ঢুকতে লাগলো।



আমি বুঝলাম যা হবার হয়ে গেছে এবার অদ্দৃষ্টের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। আমার মাথাটা কেমন হাল্কা হয়ে যেতে লাগলো। অংকের ক্লাসগুলো ফাঁকি দেবার দিন গুলো চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। আবার বয়ষ্ক ভদ্রলোকের গলার আওয়াজে হুঁশে ফিরলাম।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : তোমার সামনে একটা বড় মগ রাখা আছে।



আমি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি হ্যাঁ একটা বড়সড় মগ রাখা আছে বৈকি।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : ওই দেখ ওদিকে ডাঙা দেখা যাচ্ছে।



আমি একটু চোখ কচলে নিয়ে দেখলাম সত্যিই ডাঙা দেখা যাচ্ছে সামনে।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : এই মগ দিয়ে জল কাঁচিয়ে বাইরে ফেললে আমরা ডাঙা পর্যন্ত বেঁচে পৌঁছে যেতে পারব।



নতুন করে জীবন ফিরে পাবার আনন্দে আমি মগ দিয়ে জল কাঁচাতে উদ্যত হলাম। এমন সময় ভদ্রলোক আমাকে থামালেন।



- দাঁড়াও। আগে একটা প্রশ্নের জবাব দাও।

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : নৌকার ফুঁটো দিয়ে মিনিটে ৫০ লিটার জল ঢুকছে আর এতক্ষনে নৌকার পাঁচ ভাগের এক ভাগ জলে ভরে গেছে। মগ দিয়ে কাঁচিয়ে ফেললে ১০ সেকেন্ডে ১১ লিটার করে জল বাইরে ফেলা যাবে। এখান থেকে ডাঙায় পৌঁছাতে ১০ মিনিট সময় লাগলে ডাঙায় পৌঁছানোর পর নৌকার কত শতাংশ জলে ভরে থাকবে?



আমি এবার হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললাম। জল ভর্তি নৌকার মধ্যেই বসে পড়লাম। কাঁদতে কাঁদতে ভদ্রলোক কে দুহাত জোড় করে বললাম,



- আমায় ক্ষমা করে দিন, আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনও অংকে ফাঁকি দেব না। আমি বুঝতে পেরেছি আপনি ভগবান, আমাকে শাস্তি দিতে মর্তে নেমে এসেছেন। আমায় ক্ষমা করে দিন.. আমায় ক্ষমা করে দিন।



বয়ষ্ক ভদ্রলোক অট্টহাসি দিয়ে বললেন

- আমি ভগবান টগবান নই। তবে লোকে আমাকে যমের ভয় পায়।



এতক্ষনে নৌকা অর্ধেকের বেশী জলে ভরে গেছে।

- আমি : (হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে) কে আপনি?

- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : (একটু হেসে) আমি নাগ।



মনে পড়লো ওনার ছড়ির সাপটার কথা।



- বয়ষ্ক ভদ্রলোক : (একটু বিরতি দিয়ে) কেশব চন্দ্র নাগ।



এই কথাট শোনার পরেই আমি সম্পুর্নরূপে আমার চৈতন্য হারালাম। আমার শরীর টা হাল্কা হয়ে যেতে লাগলো। নৌকা জলে ভরে গেছে আর আমিও আস্তে আস্তে জলের মধ্যে ঢলে পড়তে লাগলাম, শুধু কানে শোনা শেষ কথা গুলো বারে বারে মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো,



- আমি নাগ... কেশব চন্দ্র নাগ।



চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে চোখটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন সময় একটা ঢেউ এসে মুখে ধাক্কা মারলো। আর আমার সামান্য বেঁচে থাকা জ্ঞানে দূর থেকে একটা ডাক শুনতে পেলাম।



- বুকুন! এই বুকুন!! কিরে উঠবিনা? কাল তোর অংক পরীক্ষা খেয়াল নেই?



ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে দেখি, মা আমাকে জাগাবার জন্য মুখে ঠান্ডা জলের ছিটে দিচ্ছিল। আমি উঠেও যেন ঠিক ধাতস্থ হতে পারছিলাম না। সবার আগে মুখ থেকে বেরোলো,

- K C Nag কোথায়?

- মা : ওই তো ওখানে।



আমি ভয়ে ভয়ে মাথাটা ঘোরালাম। দেখলাম টেবিলের ওপর K C Nag এর পাটিগণিতের বইটা আধা খোলা অবস্থায় উল্টে রাখা। আমি কোনও কথা না বলে সোজা টেবিলে গিয়ে বইটা খুলে বসলাম অংক করতে।



- মা : (অবাক হয়ে) কিরে কি হলো তোর? অন্যান্য দিন বলে বলে তোকে অংক করতে বসানো যায়না, আজ ঘুম থেকে উঠেই সোজা বসে গেলি। ব্যাপার কি?



আমি কোনও উত্তর দিলাম না।



মা দেয়ালে টাঙানো মা কালীর ছবির দিকে তাকিয়ে দুহাত কপালে তুলে নমস্কার করে বললো,



- ঠাকুর ঠাকুর।

No comments

Error Page Image

Error Page Image

Oooops.... Could not find it!!!

The page you were looking for, could not be found. You may have typed the address incorrectly or you may have used an outdated link.

Go to Homepage