“ চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে ”
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে ”
- কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
প্রেমে পড়লে সকলের বোধ ভাস্যি লোপ পায় তা শুনেছিলাম। এবারে সেটা প্রত্যক্ষ করলাম নিজেকে দিয়ে। সাধারন চিন্তা ভাবনাও সাধারন ভাবে আর ভাবতে পারছিনা। কমলির সাথে আর কোনও কথা হয়নি সারা রাত। কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলামও না আমি। কিসব যে ভেবে গেলাম বাকিটা রাত তার কোনও মাথা মুন্ডু নেই। বাইরে কনকনে শীত, আর আমার ভেতরে তখন বসন্ত চলছে। সে এক অন্যরকম অনুভূতি, বলে বোঝানো যায় না। মালিক বলে এমন দশা প্রত্যেকের জীবনকালেই একবার করে আসে, অনেকের আবার বহুবারও আসে। এসব ছাতা মাথা ভাবতে ভাবতে কখন ভোর হয়ে গাছে টেরই পাইনি। ঘোর ভাঙলো যখন মালিক আমার ওপরের পকেটটা খুলে toilet paper এর roll টা বার করলো।
বিরক্তিকর লোক মাইরি একটা!!! ☹️
বাইরে তখন আরেক গল্প চলছে। মাথা গোঁজবার যায়গা তো নাহয় কাল রাতে বন্দোবস্ত হয়ে গেছে কিন্তু সকালে উঠে পেছন ঠেকাবার ব্যবস্থা কি হবে? মালিকরা একবার forest rest house এ ঢুকে দেখে এলো, কিন্তু তারা বাইরের লোকেদের toilet ব্যাবহার করার অনুমতি দেবে না। আর এই ব্যাপারে যখন কারও কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়না তখন প্রকৃতির কোলই ভরসা।🌳
মালিক, ভিক্টর আর দীপ চললো প্রাকৃতিক স্থানের সন্ধানে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। যেমনটা কাল রাতে বলেছিলাম এখানে ভীড় ছিল রথের মেলার মতো, তাই নিরিবিলি যায়গা পাওয়াও খুব মুশকিল। অবশেষে মালিক বললো পাহাড়ের ঢালে একটা ঝোপ মতো আছে ওটা আদর্শ যায়গা। ঝোপটা একটু নীচে আর যায়গাটাও বেশ ঢালু। তিনজনে মিলে হাতে toilet paper নিয়ে সেই ঝোপে গিয়ে ঢুকলো। মালিক পরে বলেছিল যায়গাটা এতটাই ঢালু যে সেখানে কিছু না ধরে বসাও যায়না। তাই তারা নাকি গাছের ডাল ধরে আধা ঝোলা অবস্থা তেই… ভাবুন একবার! সেই ঝোপটা ছিল রডোডেনড্রনের। এটা কল্পনা করার পর শরের উষ্ণতম দিনে, পিচগলা রদ্দুরে রডোডেনড্রনে নিয়ে রোমান্স করার আদিখ্যেতাটা বোধহয় আর কোনও বাঙালি করবে না (RIP গৌতম চট্টোপাধ্যায়)।😝
রুটি, ততকারি আর আচার বিয়ে ব্রেকফাস্টের পর শুরু হলো আবার যাত্রা। আজকের গন্তব্য গোর্খে। ঘর থেকে বেরোনোর পর বাইরেটা দেখে আমার মন ভরে গেল। যে ফালুট কাল রাত্রে ভিড় ভাড়ের জন্য বিরক্তিকর লাগছিল সেটাই এখন সম্পূর্ণ অন্যরূপে ধরা দিয়েছে। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে একটু সমতল যায়গা সেটাই ফালুট। এরকম মোহময়ী দৃশ্য দেখলে যাত্রাপথের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। জানিনা, প্রথম প্রেমের অনুভূতির কারনে বেশি ভালো লাগছিল কিনা তবে ফালুটের সৌন্দর্যের কথা অনেক গুণী জ্ঞানীরাও স্বীকার করে।
সকালে স্যাম একবার কমলি কে জিজ্ঞেস করলো,
- ফুলটা দারুন তো, কাল রাস্তায় আসবার সময় এই গাছটা দেখেছিলাম।
- কমলি : রুকু দিয়েছে। (মালিক আমার কোনও নাম দেয়নি, তাই নিজের নাম নিজেই রেখে নিলাম)
- স্যাম : Cool ইরার!
আজকের পথটা পুরোটাই নামা। আমি মালিককে আজকে আগে থেকেই বলে রেখেছি, "যদি আজকে তোমাকে ঘোড়ার মতো ছুটতে দেখেছি তো, এর পরের সমস্ত ট্রেকিং এ একাই আসবে আমাকে আর পাবেনা" মালিক হেসে বললো, "ঠিক আছে"
শুরুর রাস্তাটা পাথুরে, বড় বড় পাথরের বোল্ডার ফেলে রাস্তা তৈরি করা। রাস্তায় কিছু কিছু যায়গা খোঁড়া ছিল, কাজ চলছিল হয়তো। শুরুর দিকে একটু লোকজন ছিল রাস্তায় তারপর থেকে একেবারেই ফাঁকা। রাস্তায় যখন মালিক আর অনির্বাণ পাশাপাশি যাচ্ছিল তখন হোৎকা আমার দিকে তাকিয়ে হাল্কা করে হেসে বললো,
- ফুল!!! হ্যাঁ! 😎
আমি হাসলাম মুখে কিছু বললাম না।
- হোৎকা : ভালোই তো এগোচ্ছো গুরু। ও কি বললো, ফুলটা দেবার পর?
- আমি : পরিয়ে দিতে বললো।
- হোৎকা : বাআআআন*&%! তুমি পরিয়ে দিলে?😟
আমি আবার হাসলাম, মুখে কিছু বললাম না।
- হোৎকা : (বিষ্ময়ের সাথে) তারপর কি হলো?
- আমি : তারপর আর কিছু না।
- হোৎকা : তাও ভালো!!! প্রোপোজ করলে
- আমি : না।
- হোৎকা : কবে করবে ওর বিয়ে হয়ে যাবার পর? সালা এতো signal দিচ্ছে তোমাকে আর তুমি চুপ করে বসে আছো?
- আমি : না, এর মধ্যেই বলে ফেলবো ভাবছি।
- হোৎকা : শিগগিরই বলে ফেলো। আর ওদিকে তো গোলু সকাল থেকে পিঙ্কি পিঙ্কি করে কমলির মাথা খেয়ে নিচ্ছে।😝
কিছুদূর যাবার পর একটা সুন্দর view point এলো, যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার আশেপাশের শৃঙ্গগুলোর খুব ভালো view পাওয়া যাচ্ছিলো। মালিকের ঠিক করলো এখানে কিছুক্ষন ছবি টবি তুলবে। এক এক করে আমাদেরকে যে যার পিঠ থেকে নামিয়ে বিভিন্ন পোজ দিতে আরম্ভ করলো। আমরা যখন একসাথে বসে আছি তখন হোৎকা গোলুকে জিজ্ঞেস করলো,
- কি? পিঙ্কির case টা কদ্দুর এগোলো।
- কমলি : ও ঠিক করেছে পিঙ্কিকেই বিয়ে করবে।
- স্যাম
: Dude!
Seriously!!!
😒
- আমি : তুমি কথায় কথায় বিয়েতে চলে যাও কেন?
- গোলু : আমি সব শুনে নিয়েছি, ওকেই আমার পছন্দ, আর আমার মায়েরও পছন্দ হবে।
- কমলি : তুই তো দেখলিই না ওকে, আর ওর যদি তোকে না পছন্দ হয়।
- হোৎকা : তাহলে next আমি।😇
- কমলি : সত্যি মাইরি তোরা পারিস বটে। এটা কি স্বয়ম্বর সভা চলছে নাকি? ওর already একটা steady boyfriend আছে বলেছি তো।
- আমি : গোলু ভাই প্রথমে দেখা করো কথা বলো, আগে বোঝার চেষ্টা করো ওর তোমাকে ভালো লাগছে কিনা তার পর বাকিটা দেখবে নিজে থেকেই হয়ে যাবে। এভাবে হুট হাট করে ভালোবাসা হয় না।
- কমলি : কিছু ভালোবাসা হুট হাট করেও হয় কোনও কারন ছাড়াই। ব্যাস হয়ে যায়।
বলে আমার দিকে তাকালো। আমার মুখটা তখন নাকি blush করে উঠেছিল।☺️
হোৎকা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল। হোৎকা ব্যাটা মহা খচ্চর ঠিক তখনই আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,
- তোমার সেই বলতে না পারা প্রেমটা সম্পর্কে কিছু বলো, শুনি। আমাদেরও যদি কিছু কাজে লাগে
- আমি : ক্রিকেটে অনেক সময় কোনও বল ঠেকাতে গিয়ে ব্যাটের কোনায় লেগে ওভার বাউন্ডারি হয়ে যায় দেখেছো তো? আমারও খানিকটা তেমনই অবস্থা।
- হোৎকা : আমাদেরকেও একটু বলো ছক্কা মারার গল্প টা।
- আমি : বলবো বলবো, এখনও থার্ড আম্পায়ারের
decision
pending
আছে, ওটা আদৌ ছক্কা
কিনা।
বলে হোৎকার দিকে তাকিয়ে হাল্কা চোখ মারলাম।😉
ইতিমধ্যে মালিকদের ফটোশ্যুট শেষ যে যার ব্যাগ এসে পিঠে তুলে নিল। আমি লক্ষ্য করলাম কমলিকে দেওয়া ফুলটা মাটিতে পরে রয়েছে। জয়শ্রী যখন কমলি কে পিঠের থেকে নীচে নামিয়ে রেখেছিল তখন হয়তো পরে গেছে।
ও কি লক্ষ্য করেনি এটা?
খুব কষ্ট হলো আর হঠাৎ করে এরকম পরিস্থিতিতে মনের মধ্যে সবার যা চলে আমারও তাই চলতে লাগলো। এটা তো আর শুধুমাত্র একটা ফুল ছিলনা, আমার ভালোবাসা ছিল। এতটা careless কিভাবে হতে পারে? এতটা অবহেলা আমার ভালোবাসার? এসবের কি কনও মূল্যই নেই ওর কাছে?
ধুর সালা আমি আর ভাববোই না। ফুলটা কুড়িয়ে নিলাম মাটি থেকে। মালিক বলে নিজের কষ্টের কথা, খারাপ লাগার কথা অন্যদের বলার সময় খুব পরিমিতভাবে বলতে হয়। কারন মন দিয়ে তোর কথা যখন কেউ শুনছে তখন তাদের কাছে যেন তোর কষ্টের কথাটা প্যানপ্যানানি মনে না হয়। তাই প্যানপ্যানানি র পর্যায়ে আর গেলাম না। তবে কষ্টটা বেশ ভালোমতোই দানা বাঁধছিল বুকের ভেতর।😔
এর পরের পুরোটা রাস্তা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছিল। কোথাও ছোট ঝোপ আবার কোথাও বড় বড় গাছ। মালিক মাঝখানে আমাকে বললো,
- বুঝলি, সান্তাজী এই রাস্তা দিয়ে নাকি কাল রাত্রে আমাদেরকে আনতে চাইছিল! সালা পাগলাচো*&%🤓
- আমি : হুম।
- মালিক : কি হলো সকালে তো বেশ ছটফট করছিলি, এখন ব্রয়লার মুরগীর মতো ঝিমিয়ে আছিস কেন?
- আমি : কিছু না।
- মালিক : লেঙ্গি খেয়েছিস? দেবদাস syndrome?😜
বলে খিক খিক করে হাসতে লাগলো। mood টা এমনিতেই off ছিল তার ওপর এসব শুনে মেজাজটা আরও গরম হয়ে গেল।
- আমি : এ্যাই তুমি আগে চলো তো বা&%.🤬
মালটা তখনও খিক খিক করে হেসে যাচ্ছে।
রাস্তায় যেতে যেতে মাঝে খাবার জন্য পার্থদা রা কিছু ফ্রুটি, চকলেট এসব প্যাক করে নিয়ে এসেছিলো। সেগুলো গেলার জন্য মাঝে সবাই কিছুক্ষনের break নিলো। তারপর আবার চলা শুরু। কিছুক্ষন যাবার পর বুদ্ধি ঠোঁট আঙুল দিয়ে শশশ করে সবাইকে চুপ করতে বলে আর হাত দিয়ে ইশারা করে থামতে বলে। তাতে সবাই থেমে যায়। বুদ্ধি পাশের একটা গাছে ইশারা করে। ওখানে একটা Himalayan Crow বসে আছে। সবাই যে যার ক্যামেরা বার করে ছবিটবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এরকম যেতে যেতে জঙ্গলের ভেতর আরও অনেক নাম না জানা সুন্দর সুন্দর পাখিদের সাথে দেখা হয়েছিল। Singhalila National Park বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখির জন্য বিখ্যাত। এভাবে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নামতে নামতে অবশেষে পৌঁছানো গেল গোর্খে।
এবার এই গোর্খে যায়গাটার একটা গল্প আছে। মালিক রা এটার নাম দিয়েছে Home away from home. কতবার যে এখানে এসছে তার কোনও ঠিক নেই। এখাকার সরকারি ট্রেকার্স হাটের care taker রামপ্রসাদ জী মালিকদের ইয়ার দোস্তের মতো হয়ে গেছে। মালিকরা ওনাকে পাহাড়ী বাবা বলে ডাকে। তবে এবারে যেহেতু সান্তাজী সব booking গুলো নিজে ঠিক করেছে তাই মালিকদের আর বাবার বাড়িতে থাকা হয়নি। অন্য একটা home stay তে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।
১২ টার মধ্যেই সবাই গোর্খে পৌঁছে গিয়েছিল। গিয়ে সবাই যে যার মতো fresh হয়ে বাইরে চেয়ার পাতা ছিল ওখানে গিয়ে বসলো। এই home stay তে সবার জন্য আলাদা আলাদা খাটের ব্যাবস্থা ছিল। যাক, এতদিন পর এবার অন্তত মালগুলো ভালো করে ঘুমোতে পারবে। মালিক হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখে ইতিমধ্যেই পার্থদা রা আর সৌমিক beer এর বোতল খুলে বসে গেছে। দেখেই মালিকের বত্রিশ পাটি বেড়িয়ে এলো। একে একে সবাই এলো আর beer এর চাহিদাও বাড়তে লাগলো। সাথে ছিল আলুর পরোটা, সেটাই ওদিনের lunch ছিল। পরে মালিক বলেছিল ওই দিন এক একটা পরোটা নাকি ১৫০ টাকা করে bill করেছিল। পার্থদা রা পরে জানিয়েছে।
বাইরে যখন জোর কদমে খানা পিনা চলছে আমরা তখন সবাই ঘরের ভেতর। আমি কারও সাথে খুব একটা বেশি কথা বলছিলাম না। কমলি আমার কাছেই ছিল। আমাকে আস্তে করে বললো,
- শোন না
- আমি : কি?
- কমলি : রাগ করবি না বল।☹️
আমি একটু ঝাঁজালো স্বরেই বললাম,
- ন্যাকামো করিস না তো, যা বলতে হয় বল।
আমি তো আগেই জানি ও কি বলতে চাইছে। কিন্তু ও জানেনা যে আমি সেটা জানি।
- কমলি : এভাবে কথা বলছিস কেন আমার সাথে?😒
আমি ওর কথার কোনও উত্তর দিলামনা, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলাম।
- কমলি : শোন না, তুই যে ফুলটা কাল রাতে আমাকে দিয়েছিলি ওটা না কোথাও একটা পড়ে গেছে।
- আমি : তো! আমাকে কেন বলছিস? রাস্তায় আরও অনেক ফুল পাবি কুড়িয়ে নিস।
- কমলি : আমি জানি তোর রাগ হবে, আসলে কি জানিস তো…
আমি মাঝপথেই ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
- শোন যা করেছিস বেশ করেছিস, তোর কথা শোনার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। আর রাগ টাগ আমার হয়নি, কষ্ট হয়েছে আর এটা বুঝতে গেলে যে অনুভূতিটা দরকার সেটা তোর মধ্যে নেই।
বলে আমি গোলু, হোৎকা আর স্যামের কাছে গিয়ে গল্প করতে লাগলাম। কিন্তু আমার ভাঙাচোরা মনটা অন্যখানে পড়ে ছিল। কমলিকে কথাগুলো বলার পর নিজেরই খারাপ লাগছিল। মালিক বলে জখমি বাঘ আর আহত প্রেমিক, এদের থেকে সব সময় দূরে থাকতে হয়। এরা নিজের অজান্তেই নিজের চারিপাশের প্রিয়জনেদেরও ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে। একটু পরে স্যামের সাথেও ফালতু একটা কারন নিয়ে কথা কাটাকাটি আর ঝামেলা হয়।
ধুর সালা, দিনটাই খারাপ আজকে!!!!😓
মালিকেরা বাবার ধামে এসছে অথচ বাবার সাথে সাক্ষাৎ করবে না তা কি কখনও হয়। বিকেলের দিকে বাবার সাথে দেখা করতে গেল সব দল বেঁধে। আচ্ছা, গোর্খে যায়গাটা সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা বলে নি আগে। একটা ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম বলতে আপনাদের চোখের সামনে যে ছবি ভেসে ওঠে এই যায়গাটা ঠিক তাই। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা আর মাঝখান দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। হ্যাঁ বৈশাখ মাসে তাতে হাটুজলও থাকে তবে সেখানে বালি চিক চিক করে না, বড় বড় পাথরের বোল্ডার রয়েছে, ওর ওপর বসে আপনারা দিব্যি আড্ডা মারতে পারেন। মালিকেরা ওগুলো কে বলে Beer point. নদীর ওপর একটা কাঠের সেতুও আছে। মালিকেরা ছিল নদীর এপারে আর রামপ্রসাদজী থাকত নদীর ওপারে।
রামপ্রসাদজীর কাছে গিয়ে প্রথমে কিছুক্ষন কুশল বিনিময় হলো। রামপ্রসাদজী আক্ষেপ করলো, মালিকেরা এবার তার ওখানে থাকেনি তার জন্য। আর সবশেষে যেটা ঠিক হলো রাতের বেলায় ওখানে bon fire এর ব্যবস্থা হবে সাথে ঝলসানো মুরগী আর তার সাথে যা হয় আর কি। সরকারি ট্রেকার্স হাটের পেছনটাতে একটু খোলা মাঠ মতো যায়গা আছে ওখানেই আগুনের ব্যবস্থা হলো। মালিকেরা প্রতিবার এখানে এলে এই যায়গাটাতেই মোচ্ছবের ব্যবস্থা করে।
ফুর্তি তখন মধ্য গগনে ঝলসানো মাংস সাথে কড়া পানীয় গান বাজনা সব পাল্লা দিয়ে চলছে। চারিদিকে একটা উৎসবের আমেজ এর মধ্যে হঠাৎ কোথা থেকে একটা আওয়াজ এলো,
- সালাআআআ শয়তাআআআন, হারামজাদা *&%৳#@।🤬
আওয়াজটা এতটাই জোড়ে ছিল যে বাকি সমস্ত আওয়াজ ওর নীচে চাপা পড়ে গেল। কিছু বোঝার আগেই একটা খালি প্লাস্টিকের জলের বোতল সাঁ করে ছুটে এল ভিক্টরের দিকে।
কি হলো ব্যাপারটা?
আসলে হয়েছে কি? সকালে পার্থদা রা রাস্তার জন্য যে চকলেট খেতে দিয়েছিল সেটার একটা সৌমিকের পকেটে রয়ে গিয়েছিল। ও তখন সেটা বার করে যেই খেতে যাবে তখন,
- ভিক্টর : সালা কি খাস? আমাকে দে!
সৌমিকের মাথায় তখন কি আসে কে জানে ও অর্ধেক চকলেটটা মুখে নিয়ে বাকিটা মুখের বাইরে থেকে ভিক্টর কে নিতে বলে। আর সেও ওর মুখের বাইরে থেকে বাকি অংশে কামড় বসায়। (মালিক বার বার কিরে বলে দিয়েছে এই লেখার পড়ে মালিক দের যেন বাঁকা চোখে কেউ না দেখে, এদের মধ্যে এসব খচরামি মামুলি ব্যাপার) কিন্তু বিপত্তিটা হয় যখন এটা জয়শ্রীর চোখে পড়ে। সে তো এসব দেখে রেগে আগুন তেলে বেগুন। পারলে ভিক্টর কে তখনই পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেয় আর কি। কেউ তাকে আর বুঝিয়ে পাড়েনা যে ওটা নিছকই মজা ছিল। সবাই মিলে তাকে কিছুটা বুঝিয়ে সুঝিয়ে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
মালিকদের রাতের dinner এ সেদিন ছিল খিচুড়ি, ওমলেট আর আচার। খাবার টেবিলে পর্যন্ত জয়শ্রী ভিক্টরের পাশে বসেনি।😡 খাওয়া দাওয়ার পর ঘর অন্ধকার করে সবাই যখন শুয়ে পরে তখন হটাৎ বাথরুম থেকে মৈনাকের আওয়াজ আসে। একটু অন্য রকম লাগলো আওয়াজটা। গোলু আমাকে আস্তে করে বললো,
- রামচন্দ্র বেড়িয়ে আসছেন পার্থিব শরীর থেকে।🤮
কিছুক্ষন মদ্ধে সবাই চুপচাপ। আর আমি ভেতর ভেতর জ্বলছি আমার জ্বালায়। কমলি আমার কাছেই ছিল। জানালা দিয়ে বাইরের সামান্য আলো আসছিল ঘরে। একটু পরে কমলি আমার দিকে মুখ ফিরে বললো,
- রুকু আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে করিনি, বুঝতে পারিনি কখন ওটা পরে গেছে।
আমি চুপ করে আছি
- কমলি : আমার সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে রে বিশ্বাস কর। I am sorry 😔😔
ওর গলাটা ধরে এলো। আমি রুকস্যাক হতে পারি কিন্তু হাজার হোক পুরুষের হৃদয় তো! কতক্ষন আর বুকে পাথর চেপে রাখা যায়। আমি আমার side pocket থেকে ওই কুড়িয়ে নেওয়া ফুলটা কমলির হাতে দিয়ে বলমাম,
- এটা শুধুমাত্র একটা ফুল নয়। এবার থাকে যত্ন করে রাখিস।🌷
ও ফুলটা নিয়ে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো। বাইরের খুব ক্ষীণ আলোতেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম ওর চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে।😪 আর ওই চোখ যে সেদিন কি বলতে চাইছিল সেই আকুতি, সেই বেদনা, সেই কষ্ট, সেই অভিমান, সেই সমর্পণ, ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার ইচ্ছে করলো তখনই ওকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু মনে হলো যেন গলুটা পাশ থেকে মিট মিট করে দেখছে।🤨
কমলি আমার বা দিকের ফিতেটা ওর দুই ফিতার মধ্যে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
- আর কখনও এভাবে কষ্ট দিস না আমাকে, তাহলে কিন্তু আমি মরেই যাব।
আমি ওর সংলাপটা শুনে্ আস্তে করে ওকে বললাম,
- তুই প্রচুর বাংলা সিরিয়াল দেখিস, তাই না!🤔
কমলি কাঁদতে কাঁদতেই ফিক করে হেসে বললো,





No comments