অন্ধকার স্ক্রিন।
ব্যাকগ্রাউন্ডে পাখির কিচির মিচির আর লোকজনের হাটা চলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রেমিক - আচ্ছা, একটা প্রেমের সম্পর্ক মূলত কিসের ওপর টিকে থাকে?
প্রেমিকা - বিশ্বাস?
প্রেমিক - আর একসাথে অনেক গুলো সম্পর্ক থাকলে?
প্রেমিকা - আত্মবিশ্বাস!
-ফেড ইন-
-ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট-
ছবি স্পষ্ট হলে পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে এক প্রেমী যুগল লেকের পাড়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। বিকেল বেলা পড়ন্ত সূর্যের আলো লেকের জলে প্রতিফলিত হয়ে চকচক করছে। আশেপাশে আরও অনেক প্রেমিক প্রেমিকা এদিক ওদিক বসে আছে। কিছু বয়ষ্ক লোক হাটা হাটি করছে। হকার চা, বাদাম ভাজা হাঁক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
প্রেমিক হাতে বাদামভাজা নিয়ে একটা একটা করে মুখে দিচ্ছিল। প্রেমিকার এই উত্তরটা শোনার পর সে কিছুক্ষন প্রেমিকার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর দুজনেই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো।
-কাট টু ড্রইং রুম -
সময়টা সন্ধে। বাইরে হাল্কা মেঘ ডাকছে। একটা সাজানো ড্রইং রুম। মাঝে একটা কাঁচের টেবিল। সেখানে কিছু ফিল্ম ম্যাগাজিন রাখা। অ্যাশ ট্রেতে কিছু সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে।
কাঁচের টেবিলের একপাশে একটা সোফা আর উল্টো দিকে একটা চেয়ার সেখানে একজন বসে আছে। বয়স আনুমানিক ৩৫ থেকে ৩৮। নীল জিন্সের প্যান্ট আর কালো টি-শার্ট। চেয়ারের পাশে একটা ছোট ব্যাকপ্যাক রাখা। পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে চেয়ারের হাতলে ডান হাতটা ভর দিয়ে বাইরে ঝোলানো আর হাতে একটা ভয়েস রেকর্ডার ইন্সট্রুমেন্ট ধরা।
একটু দূরে ঘরের কোনে একটা ছোট মত বার কেবিনেট সেখানে একজন ভদ্রলোক ড্রিঙ্কস রেডি করছে। লোকটি বয়স চল্লিশোর্ধ্ব, পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। চোখে চশমা। মাথায় কাঁচাপাকা অগোছালো চুল। কেবিনেটের ওপরে দুটো গ্লাস রাখা এবং দুটোতেই কিছুটা সোনালী পানীয় দেখা যাচ্ছে। ভদ্রলোক আইস বাকেট থেকে দুটো বরফ নিয়ে একটা গ্লাসে ঢেলে জিজ্ঞাসা করলেন,
- বরফ কটা চলে?
চেয়ারে বসা লোকটা উত্তর দিল,
- হুইস্কি তো! চারটে দিন। নো ওয়াটার।
বয়ষ্ক ভদ্রলোক দুটো গ্লাস নিয়ে এসে কাঁচের টেবিলে রাখলেন। তারপর সামনের সোফায় বসে নিজের গ্লাসটা তুলে নিয়ে সামনের ব্যক্তিটিকে বললেন,
- নিন শুরু করুন
সামনের লোকটা হাতের রেকর্ডার ইন্সট্রুমেন্ট টা টেবিলে রেখে নিজের গ্লাসটা তুলে নিল। তারপর দুজনে নিজেদের গ্লাস একে অপরের সাথে ছুঁইয়ে, চিয়ার্স!
অল্পবয়সী লোকটা একটা সিপ দেবার পর মাঝবয়সী ভদ্রলোক কে জিজ্ঞাসা করলেন,
- এবার তাহলে ইন্টারভিউটা শুরু করি, নীলাদ্রি দা।
নীলাদ্রি সামনের সোফায় একটা পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। বা হাতটা লম্বালম্বিভাবে সোফার ওপরের অংশটায় রাখা আর ডান হাতে গ্লাসটা নিজের মনে ঘুরিয়ে জাচ্ছে। যার ফলে ভেতরের বরফের টুকরো গুলো কাঁচের গ্লাসে ধাক্কা লেগে টুংটাং আওয়াজ হচ্ছে।
- নীলাদ্রি : বলো কি জানতে চাও?
সামনের লোকটা ভয়েস রেকর্ডার টা অন করে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
- আপনার পরবর্তী ছবি নিয়ে বাজারে খুব হৈচৈ চলছে। সবাই জানতে ইচ্ছুক এবার আপনি কোন গল্প নিয়ে ছবি করছেন? আসলে আপনার আগের ছবিতে আপনি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ব্যাপারটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন, যা বাংলার দর্শক আগে কখনও দেখেনি। তাই স্বভাবতই প্রত্যাশার পারদটা এবার অনেকঅটাই হাই। এবারের আপনার ছবির গল্প নিয়ে যদি অল্প করে কিছু বলেন।
- নীলাদ্রি : (একটু হেসে) এবারের গল্পটা খুব সিম্পল। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির কনফ্লিক্ট! এটা একজন লেখকের গল্প যার তৈরি করা চরিত্রেরা তার সাথে কমিউনিকেট করে, কথা বলে। সমস্যাটা শুরু হয় যখন লেখকের ভাবনা আর চরিত্রের ভাবনা কনফ্লিক্ট করে।
- রিপোর্টার : বেশ ইন্টারেস্টিং। কিরকম ব্যাপারটা?
-কাট টু ছোট ঘর-
- ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটে-
একটা ছোট ঘর সেখানে একটা কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপরে একটা লাইট ঝুলছে। একদিকের একটা চেয়ারে এক বুড়ো ভদ্রলোক বসে আছে। উনি টেবিলের সামনে ঝুঁকে কাগজে কিছু একটা লিখে যাচ্ছেন। ওনার মাথার চুল কোঁকড়ানো এলোমেলো। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। পরনে একটা ময়লা পাঞ্জাবি আর ধুতি। একটা পা চেয়ারের ওপর তুলে এক মনে লিখে চলেছেন। টেবিলে একটা চায়ের ভঁড়ে কিছু বিড়ির টুকরো পড়ে আছে।
-দরজায় আওয়াজ-
লেখক লেখা থেকে মুখ না উঠিয়েই জিজ্ঞাসা করলেন,
- কে?
দরজার একটা পাল্লা অল্প খুলে একজন মুখ বাড়িয়ে উঁকি মেরে বললেন,
- আসবো নাকি?
লেখক এবার মুখ তুললেন। মুখের আদল পুরো নীলাদ্রির মতো।
- লেখক : আমি এহন তোমারে নিয়া লিখতাসিনা, পরে আইসো।
- চরিত্র ১ : সামান্য দুটো কথা ছিল স্যার, বেশিক্ষন লাগবে না।
- লেখক : এহন সময় নাই আমারে বিরক্ত কইরো না।
- চরিত্র ১: অল্প করে স্যার, ছোট্ট করে বলবো স্যার প্লিজ স্যার প্লিজ স্যার।
বলে নিজে থেকেই ঘরে ঢুকে টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারটাতে বসে পরলো।
- লেখক : তোমার চরিত্রটারে কেন যে এমন ইরিটেটিং বানাইতে গেমাল কে জানে? অহন হালায় আমার ঘাড়েই আইয়া পরসে। কি চাইডা কি তুমার?
-চরিত্র ১ হাত কচলাতে কচলাতে বললো-
- বলছিলাম যে, স্যার গল্পটা এরকম করলে হয় না? মানে নায়িকা যদি শেষ পর্যন্ত পুরোনো প্রেমিক কে ছেড়ে নতুন প্রেমিকের সাথেই বাকি জীবিনটা কাটাবে ঠিক করে! মানে বলছিলাম যে তাহলে লোকে আরকি খাবে বেশি। আর তাছাড়া…
- লেখক : থামো। তুমি কি আমারে এই বুঝানের লেইগা আইছো? হ্যাঁ!
-বলে হাত থেকে পেনটা রেখে-
- শুনো উজবুগ, লোকে কি খাইবো কি খাইবো না সেই বুইঝ্যা যদি সব কাজ হইতো না, তাইলে পৃথিবীতে মহান শিল্প কিছুই তৈরিই হইতো না। যত রাজ্যের মিডিওকার চিন্তা ভাবনা! আর শুনো এইসব বোঝোনের লেইগ্যা যেই ইন্টালেক্টটা দরকার তোমার চরিত্রে আমি সেইটা দেই নাই। হুঃ আমারে বুঝাইতে আইসে আমার গল্প আমি কিভাবে লিখুম, স্কাউন্ড্রেল!
- চরিত্র ১ : আচ্ছা তাহলে হিরোইনের আরেকটু কাছে যাবার সুযোগ দিন। মানে…
- লেখক : মানে আর বুঝান লাগবো না। যা বুঝার আমি বুঝঝি। মাথার ভিতরে গোবর ভরা থাকলে এইর থিকা বেশি আর কিসু বাইরইবো না। দূর হও অহন আমার সামন থিকা।
- চরিত্র ১ : তাহলে দিচ্ছেন তো?
- লেখক : তুমি এমনিতে যাবা না লাইথ্যায় ভাগামু।
-কাট টু লেকের ধার-
ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটে
প্রেমিক আর প্রেমিকা পা ঝুলিয়ে বসে আছে। প্রেমিকের মুখের আদল সম্পূর্ণ চরিত্র ১ এর মতো।
- প্রেমিক : বাদাম খাবে?
বলে বাদামওয়ালা কে ডাক দিল
- প্রেমিকা : আজ এত খাই খাই করছো কেন বলোতো।
- প্রেমিক : আজ প্রচন্ড ক্ষিদে আমার
বলে মুখটা হা করে সিংহের মত গর্জন করে মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেলো প্রেমিকার মুখের কাছে
- প্রেমিকা : কি করছো টা কি সবার সামনে।
- প্রেমিক : একলা আর তোমাকে পাই কোথায়?
- প্রেমিকা : ছাড়ো এসব,আজকে কি হয়েছে শোনো। সকালে আমি একটা কাজে লেক টাউন গিয়েছি। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা পার্ক মতো যায়গায় দেখি শুভাশিস দা বসে আছে একজন অন্য মহিলার সাথে।
- প্রেমিক : শুভাশিস দা টা আবার কে?
- প্রেমিকা : আরে আমার বান্ধবী আছে বলেছিলাম না! মৌ। ওর বর। তারপর শোনো না, আমি ওনাকে এখানে দেখে প্রথমে চমকে গেলাম তারপর কাছে গিয়ে বললাম,
"শুভাশিস দা, ভালো আছেন?"
- প্রেমিক : ইসস কি দরকার ছিল?
- প্রেমিকা : ওনার মুখটানা তখন দেখার মতো ছিল। মনে হলো যেন ভূত দেখে ফেলেছে। থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কি বলবে কি না বলবে কিছুই বুঝতে পারছিলো না। আমিই পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য বললাম,
"কাজে এসছিলেন না? মৌ ভালো আছে?"
আমতা আমতা করে বললো,
"হ্যাঁ হ্যাঁ ভালো আছে ভালো আছে"
পাশের মহিলা তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে।
- প্রেমিক : তুমি পারো বটে, কি দরকার ছিলো বেচারাকে এমব্যারাস কারার। (কিছুক্ষন পরে) তবে প্রেম করতে গেলে একটু সাহস লাগে। বুকের পাটা না থাকলে প্রেম করা উচিৎ না। তার ওপর পরকীয়া প্রেমেতো সাহসটা আরেকটু বেশিই লাগে।
বলে একটা চোখ মেরে জামার কলারটা একটু তুলে ধরলো।
- প্রেমিকা : উঁহ এসেছে আমার বীরপুরুষ রে!
-কাট টু ড্রইং রুম-
- ইন্টারভিউয়ার : গল্পটায় নতুনত্ব আছে কিন্তু এটা মেইনস্ট্রিম দর্শকেরা কি নিতে পারবে?
- নীলাদ্রি : আমি তো আমার গল্প বলি। তোমাদের মতো ম্যাগাজিন সেটাকে আর্ট আর মেইনস্ট্রিম তকমা দেয়। একটা জিনিস জানো? দর্শকদের ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার পেছনে অনেকাংশে তোমরাই দায়ী। লোকে তাই খাচ্ছে যা তোমরা খাওয়াচ্ছো। আর তোমরা দিনের পর দিন ভালো শিল্পের নামে মিডিওকার ছবিকে তোল্লাই দিয়ে এসেছো। লোকে স্বাদটা পাবে কোথা থেকে? বাই দ্যা ওয়ে, মৌ বলছিল তোমাদের গত মাসে নাকি রেকর্ড সেল হয়েছে।
রিপোর্টার একটু হেসে বললো,
- হ্যাঁ। ওই ই-পাবলিকেশন হবার পর বিক্রি অনেকটাই বেড়ে গেছে। আচ্ছা আমরা আবার ইন্টারভিউ তে ফিরে আসি,
- রিপোর্টার : আপনার সব ছবির চিত্রনাট্য তো আপনি নিজেই লেখেন। এবারেও কি তাই? এবারেও কি আপনি নিজেই লিখছেন?
- নীলাদ্রি : হ্যাঁ অবশ্যই। আমি যেই যেই ক্যারেক্টর কে নিয়ে কাজ করবো সেগুলো আমি তৈরি না করলে তাদের ইমোশনস বুঝবো কি ভাবে? আমার সব ক্যারেক্টরের সৃষ্টি ও আমার হাতে আর পরিনতিও আমার হাতে।
বলে একটু হাসলো।
- রিপোর্টার : আচ্ছা আপনার ছবির সব ক্যারেক্টরই কি বাস্তব থেকে নেওয়া।
- নীলাদ্রি : সব সময় নয়, তবে হ্যাঁ অধিকাংশ সময়ই আমার ক্যারেক্টরগুলো বাস্তবের কোনও না কোনও চরিত্র থেকে নেওয়া থাকে।
- রিপোর্টার : কখনো এমন হয়েছে যে একটা পর্যায়ের পর আগে কি হবে তা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, বা মাথায় কোনও নতুন আইডিয়া আসছে না। মানে যাকে ভালো ভাষায় রাইটার্স ব্লক বলে।
-কাট টু ছোট ঘর-
ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট
লেখক ঘাড় গুঁজে চেয়ারের ওপর একটা পা তুলে লিখে যাচ্ছে। সাদা কাগজের ওপর কালো কলমে লেখা। উনি লিখছেন
"…জিজ্ঞাসা করলো এর মধ্যে যাবে কি করে? বাইরে তো তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। ওই যে নীল ছাতাটা দেখছো ঘরের কোনায় ওটা নিয়ে যাও…"
এমন সময় দরজায় আওয়াজ হলো। লেখক একই ভাবে লেখা থেকে মুখ না তুলে জিজ্ঞেস করলো,
- কে?
এক মহিলা কন্ঠে ভেসে এলো
- ভেতরে আসতে পারি?
বলে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলো। মহিলার মুখের আদল পুরো প্রেমিকার মতো
- মহিলা : একটু কথা ছিল আপনার সাথে।
- লেখক : অঁ তোমারো কথা আছিলো? আমি এইডাই ভাবতেসিলাম চরিত্র ২ এতো দেরি করতাসে কেন আসতে। বলো তোমার কি বক্তব্য।
বলে হাতের পেনটা রেখে দিল। চরিত্র ২ সামনের চেয়ারটাতে গিয়ে বসলো।
- চরিত্র ২ : একটা সমস্যা হচ্ছে।
- লেখক : তোমারও সমস্যা আছে? তোমাদের সবারই জীবনই দেখতেসি সমস্যায় ভরা। আর আমি এইহানে বইয়া আছি তোমাগো সমস্যার সমাধানের লেইগ্যা। বইলা ফালাও,
- চরিত্র ২ : আমার কোনও অনুতাপ বা অনুশোচনা হচ্ছেনা।
- লেখক : হওয়ার তো কথাও না।
- চরিত্র ২ : মানে? আমি যাকে এতদিন ভালোবেসে এসেছি তাকে ঠকিয়ে আমি আরেক জনের সাথে লুকিয়ে প্রেম করছি। আমার তো একটা গিল্টি ফিলিংস থাকার কথা, কিন্তু সেটা আমার আসছে না।
- লেখক : মাঝে মাঝে তোমাগো কান্ড কারখানা দেইখা আমি হাসুম না কান্দুম কিছুই ঠাউরাইতে পারিনা। একটা কথা কয়বার কমু তোমাদের? তোমরা যা যা করতাসো, যা যা ভাবতাসো সব আমি চাইতেসি তাই। আমার গল্পের চরিত্র তোমরা। আমি যেমন ভাবে তোমাদের চালাবো তোমরা তেমন ভাবেই চলবা। আমি যেই পরিনতি লিখবো তোমাদের সেই পরিনতি হইবো। আমি যেমন ভাবে তোমাদের ভাবাবো তোমরা তেমন ভাবেই ভাববা।
- চরিত্র ২ : কিন্তু আমি যখন লুকিয়ে কিছু করছি আর সেটা নিজেই বুঝতে পারছি ঠিক হচ্ছে না, অথচ কোনও পাপ বোধও করছি না। এটা তো অন্যায়।
- লেখক : তোমারে কে কইসে? আমি যখন আমার চরিত্র তৈরি করি তখন ন্যায়, অন্যায়ের মাপকাঠি আমি নিজে বানাই। কারন এইটডা আমার দুনিয়া এইখানে আমার কথাই শেষ কথা, আমার নিয়মই শেষ নিয়ম।
- চরিত্র ২ : কিন্তু ব্যপারটাতো ঠিক না।
- লেখক : আই দূর হও তো আমার চোখের সামনের থিকা। ঠিক ব্যঠিক মারাইতে আইসে এইখানে।
এরপর রেগে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
- সব সালা মিডিওকার বাইঞ্চোদের দল।
-কাট টু লেকের ধার-
ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটে
- প্রেমিক : বীরপুরুষ তো বটেই, সবার নাকের ডগা দিয়ে তোমাকে লেকে নিয়ে এসে খুল্লাম খুল্লা প্রেম করছি। এতে সাহস লাগে না?
প্রেমিকা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললো,
- এতে কারোই কিছু আসে যায়না।
- প্রেমিক : তোমার বরেরও না?
- প্রেমিকা : মনে হয় না, আসলে আমাদের সম্পর্কটা খুব অদ্ভুত। আমরা আমাদের ভেতরের কথা কেউই কারো সাথে শেয়ার কিরিনা। কেমন একটা গতানুগতিক ভাবে আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপন চলে। মনে হয় আমার কোনও ব্যাপারেই ওর কোনও ইন্টারেস্ট নেই। আমরা দুজন একই ছাদের নীচে থাকি ঠিখই কিন্তু বসবাস করি দুজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে।
- প্রেমিক : তাতে কি! আমি আছি তো, আমি তো তোমার প্রতি ১০০% ইন্টারেস্টেড।
- প্রেমিকা : না, আসলে ও কখনও নিজে থেকে কিছু বলেও না, ভালো আছে না খারাপ আছে কিছুই বুঝতে পারিনা। তবে এখন ওসব বোঝাবুঝি ছেড়ে দিয়েছি! এসব করে আর লাভ নেই, নিজের খুশি নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। ভালো লাগা তো অনেকদিন আগেই চলে গেছে এখন খারাপ লাগাটাও আর আসে না।
- প্রেমিক : ওঁরও কি অন্য কোথাও চক্কর আছে?
- প্রেমিকা : ধুর! ওকে কে সহ্য করবে আমার মতো।
ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। জোরে জোরে কেউ একজন ডাকছে।
- নীলাদ্রি দা, ও নীলাদ্রি দা!
-কাট টু ড্রইং রুম -
ফেড ইন
-রিপোর্টার : ও নীলাদ্রি দা। ঠিক আছো?
নীলাদ্রি সোফায় বসা, ডান হাতে গ্লাস ধরা, আর বা হাতটা সোফার পেছনে হেলান দিয়ে রাখা। মাথা টাও পেছনে হেলান দেওয়া। রিপোর্টারের ডাক শুনে মাথাটা সামনে নিয়ে এলো।
- নীলাদ্রি : হুঁ! কি যেন বলছিলে তুমি?
- রিপোর্টার : রাইটার্স ব্লক।
- নীলাদ্রি : হ্যাঁ রাইট রাইটার্স ব্লক। হ্যাঁ তা তো আসবেই, সকল সৃষ্টিশীল মানুষেরই হয়।
- রিপোর্টার : আপনি কিভাবে হ্যান্ডেল করেন সেটা?
নীলাদ্রি গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে একটু হেসে বললো,
- যখন দেখি আমার মাথায় নতুন কোনও চিন্তা ভাবনা আসছে না, আর চারিপাশের দুনিয়া থেকেও কিছু নেবার মতো পাচ্ছিনা, (একটু থেমে) তখন আমি নিজেই একটা সিচুয়েসন তৈরি করে ফেলি।
- রিপোর্টার : মানে?
- আমি সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করি যা আপাতদৃষ্টিতে সবার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। আর পারিপার্শ্বিক সকলে সেই তৈরি করা সিচুয়েসনের নিরিখে তাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে যায়। সেই প্রতিক্রিয়াই আসলে আমার ক্রিয়েটিভ কন্টেন্ট! আমার শৈপ্লিক খোরাক! তারা জানতেও পারেনা তাদের প্রতিক্রিয়া টা আসল, কিন্তু যার জন্য তাদের এই প্রতিক্রিয়া সেই সিচুয়েশনটাই আসলে সাজানো! নকল।
- রিপোর্টার : মানে আপনি বলতে চাইছেন আপনি নিজের আশেপাশের লকেদের ম্যানুপুলেট করেন নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য? আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই।
নীলাদ্রি গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললো,
- এসব আবার ম্যাগাজিনে ছেপে দিও না যেন!
বাইরে জোরে মেঘ ডেকে উঠলো। রিপোর্টার একটু চিন্তিত হয়ে নিজের ভয়েস রেকর্ডার ইন্সট্রুমেন্টটা বন্ধ করে বললো,
- ঠিক আছে, আজ তাহলে উঠি। থ্যানকস ফর দা ইন্টারভিউ।
- নীলাদ্রি : কেন আর কোনও প্রশ্ন নেই তোমার?
রিপোর্টার তড়িঘড়ি উঠে তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললো
- না না আর কোনও প্রশ্ন নেই আজ আসি।
- নীলাদ্রি : এর মধ্যে যাবে কি করে? বাইরে তো তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। ওই যে নীল ছাতাটা দেখছো ঘরের কোনায় ওটা নিয়ে যাও।
রিপোর্টার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরলো। রিপোর্টারের মুখের আদল হুবহু চরিত্র ১ এর মতো। সে ঘরের কোনায় গিয়ে ছাতাটা তুলে বাইরে বেড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে ছাতাটা খুললো।
-কাট টু লেকের ধার -
-ফেড ইন-
বিকেলের লেক। পরন্ত সূর্যের আলোতে লেকের জল কমলা হয়ে আছে। আশেপাশে আরও অনেক প্রেমিক প্রেমিকা এদিক ওদিক বসে আছে। কিছু বয়ষ্ক লোক হাটা হাটি করছে। হকার চা, বাদাম ভাজা হাঁক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এক প্রেমী যুগল লেকের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। প্রেমিক বাদাম ভাজা ছাড়িয়ে দিচ্ছে, প্রেমিকা হাত থেকে নিয়ে খাচ্ছে।
প্রেমিক - আচ্ছা, একটা প্রেমের সম্পর্ক মূলত কিসের ওপর টিকে থাকে?
প্রেমিকা - বিশ্বাস?
প্রেমিক - আর একসাথে অনেক গুলো সম্পর্ক?
প্রেমিকা - আত্মবিশ্বাস!
বলে প্রেমিকের দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি। প্রেমিক বাদাম ভাজা চেবাচ্ছিলো উত্তর টা শোনার পর হঠাৎ চুপ করে গেলো। কিছুক্ষণ প্রেমিকার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর দুজনেই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো।
- প্রেমিক : সত্যি মাইরি মৌবনী তুমি পারোও বটে। এসব উত্তর কি ইন্সট্যান্টলি আসে তোমার মাথায়?
প্রেমিকা একটু গর্বের সুরে হেসে বললো,
- কার বউ দেখতে হবে তো!
-কাট টু নীলাদ্রি র বাড়ির দরজা-
অন্ধকার স্ক্রিন।
ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা কলিং বেলের শব্দ।
-ফেড ইন-
দরজার বাইরে দাড়িয়ে আছে রিপোর্টার। আবার কলিনং বেলে চাপ দিলো।
-কাট-
-ফেড ইন-
-স্লো মোশন-
একজন মহিলা দরজা খুলে দিল। দরজা খোলার সাথে সাথে মহিলার মুখটা স্পষ্ট হলো। হুবহু চরিত্র ২ এর মতো।
-কাট-
-ফেড ইন-
-স্লো মোশান-
-ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা থ্রিলিং ক্লাইম্যাক্স মিউজিক ধীরে ধীরে বাজছে-
মৌবনী কে দেখার সাথে সাথে রিপোর্টার হাওয়া তে একটা কিস ছুঁড়ে দেয় তার প্রতি।
- মৌবনী : (হাসির ছলে) ধ্যাত পাগল।
- রিপোর্টার : কোথায় তিনি?
- মৌবনী : বোসো ডেকে দিচ্ছি।
-কাট-
-স্লো মোশান-
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চলছে-
মৌবনী সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে স্টাডি রুমের দিকে।
-কাট টু স্টাডি রুম-
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চলছে-
নীলাদ্রি নিজের ল্যাপটপে টাইপ করছিলো।
- মৌবনী : শুনছো!
নীলাদ্রি ল্যাপটপে চোখ রেখেই উত্তর দিলো,
নীলাদ্রি ল্যাপটপে চোখ রেখেই উত্তর দিলো,
- হুঁ।
মৌবনী : তোমাকে যে বলেছিলাম না অনির্বাণের কথা! আমাদের অফিসের রিপোর্টার। নেক্সট ম্যাগাজিন ইস্যুর জন্য তোমার ইন্টারভিউ নিতে চাইছে! ও এসেছে।
- নীলাদ্রি : ঠিক আছে ড্রইং রুমে বসতে বলো আমি আসছি।
-কাট-
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ভলিউম বেড়ে গেছে-
-ফেড ইন-
নীলাদ্রি সাদা পাঞ্জাবির হাত গোটাতে গোটাতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
-কাট-
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চলছে-
-ফেড ইন-
নীলাদ্রি বার কেবিনেটে ড্রিঙ্কস বানাচ্ছে। ফোকাসে দেখা যাচ্ছে অনির্বাণ কে।
নীলাদ্রি : - বরফ কটা চলে?
-কাট-
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চলছে-
-ফেড ইন-
বয়ষ্ক লেখক সোফায় একটা পা তুলে বসে আছে। বা হাতটা লম্বালম্বিভাবে সোফার ওপরের অংশটায় রাখা আর ডান হাতে গ্লাসটা নিজের মনে ঘুরিয়ে জাচ্ছে। যার ফলে ভেতরের বরফের টুকরো গুলো কাঁচের গ্লাসে ধাক্কা খেয়ে টুংটাং আওয়াজ হচ্ছে।
লেখক : বলো কি জানতে চাও?
-কাট-



No comments